১৯৩১ সাল। বলধা গার্ডেনের এক রাজকীয় জলসায় নিম্নবর্ণের হওয়ার অপরাধে যে মানুষটি অপমানিত হয়েছিলেন, তিনিই ঠিক করলেন, এমন এক প্রাসাদ বানাবেন যা ঢাকার সব অভিজাত বাগানবাড়িকে ম্লান করে দেবে। শুধু অপমানের প্রতিশোধ নিতে নয়, বরং নিজের আত্মমর্যাদাকে চিরস্থায়ী করতে। সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই জন্ম নেয় এই শ্বেতশুভ্র অট্টালিকা।
গল্পটা শুরু হয় উনিশশো'র গোড়ার দিকে। তৎকালীন ঢাকার হিন্দু অভিজাত সমাজের বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল গোপীবাগের বলধা গার্ডেন। সেখানে এক জলসায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন জমিদার ও ধনী ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস। কিন্তু উচ্চবর্ণের কিছু বাবুর চোখে তিনি ছিলেন 'নিম্নবর্ণের', তাই অম্লান বাক্যবাণে তাকে অপমানিত করা হয়।
অপমানের সেই আগুন জ্বলে উঠেছিল হৃষিকেশের মনে। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, বলধাকে হার মানানোর মতো এক বাগানবাড়ি তিনি গড়ে তুলবেন। ১৯৩১ সালে টিকাটুলির এই প্রান্তরে ২২ বিঘা জমি কিনে তিনি শুরু করলেন স্বপ্নের প্রাসাদ নির্মাণের কাজ। শুধু বাসস্থান নয়, এটি ছিল এক 'প্লেজার লজ', যেখানে বিরল প্রজাতির গোলাপের বাগান, ফোয়ারা আর সঙ্গীতের আসর বসত। এই গোলাপের জন্যই এর নাম হয় 'রোজ গার্ডেন'।
স্থাপত্যশৈলীতে এটি ইউরোপীয় নব্য-শাস্ত্রীয় ও ইন্দো-সারাসেনিক রীতির এক অনন্য মিশেল। সামনের দিকে রয়েছে ১০টি গ্রিক করিন্থিয়ান স্তম্ভ, যার মাথায় ফুল ও পাতার পাথরখোদিত নকশা যেন প্রাসাদের রাজকীয়তাকে ঘোষণা করছে।
ভেতরে ঢুকলেই নজর কাড়ে জটিল জ্যামিতিক নকশায় খচিত কাঠের দরজা আর বেলজিয়ামের রঙিন কাঁচের জানালা। ওপর তলায় রয়েছে বিশাল বলরুম বা নাচঘর।
এই ঘরের ছাদ যেন স্বপ্নের মতো। সবুজ আয়নার টুকরো দিয়ে ফুলেল নকশা বানানো হয়েছে, যা ঝাড়বাতির মৃদু আলোয় এক মায়াবী আবহ তৈরি করত। বলরুমের সামনে থাকা অত্যন্ত নিখুঁত এই সর্পিল সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে।
বাগান জুড়ে ছিল গ্রিক পুরাণের মার্বেল মূর্তির সমারোহ। হাতে আলোর স্ট্যান্ড ধরা গ্রিক দেবী, দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে থাকা কিউপিড— সবই ছিল ভিন্ন এক জগতের বার্তাবাহক। আর মাঝখানে ছিল একটি কারুকার্যময় ফোয়ারা, যার ধ্বংসাবশেষ আজও আছে।
বিলাসী এই জীবনযাত্রাই শেষ পর্যন্ত ডেকে আনে সর্বনাশ। মাত্র এক দশকের মধ্যে দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েন হৃষিকেশ দাস। ১৯৩৬ সালে তিনি বাধ্য হন এই স্বপ্নের প্রাসাদ বিক্রি করতে। খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশিদ নামে এক খ্যাতনামা ব্যবসায়ী ও জমিদার এটি কিনে নেন এবং নতুন নাম দেন 'রশিদ মঞ্জিল'। ১৯৩৭ সালে তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে এখানে উঠে আসেন।
পরবর্তীতে তাঁর পুত্র কাজী রকিউব এই প্রাসাদের দেখাশোনা করেন এবং তাঁর স্ত্রী লায়লা রকিউব ছিলেন এর প্রধান তত্ত্বাবধায়ক। তাদের চেষ্টায় প্রাসাদের মূল চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার করা হয়।
কিন্তু এই প্রাসাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়টি লেখা হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। ঢাকার টিকাটুলির এই 'রশিদ মঞ্জিলে' জড়ো হয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তাবড় রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারক। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতারা। সেখানেই এই প্রাসাদের বলরুমে গঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ', যা আজকের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
যে প্রাসাদটি শুরু হয়েছিল এক ব্যক্তির অপমানের প্রতিশোধ নিতে, সেটিই একাত্তরের স্বাধীনতাসংগ্রামের পথ তৈরি করা একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের জন্মস্থান হয়ে ওঠে। ইট-পাথরের এই প্রাসাদ সাক্ষী হয়ে রইল এক নতুন জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রথম ভোরের।
১৯৬৬ সালে কাজী রকিউব এই প্রাসাদটি ইজারা দেন বেঙ্গল স্টুডিওজ অ্যান্ড মোশন পিকচার্সকে। এরপর থেকে এটি হয়ে ওঠে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের স্বর্গ। জমিদার আর রাজা-বাদশাহর গল্প নিয়ে তৈরি সিনেমার শুটিং হতো এই প্রাসাদের আনাচে-কানাচে। 'হারানো দিন' ছিল এখানে শুট হওয়া প্রথম সিনেমা।
১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকাভুক্ত করে। ২০১৮ সালে সরকার এটি অধিগ্রহণ করে এবং এটিকে একটি জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেয়। আজও দাঁড়িয়ে আছে রোজ গার্ডেন প্যালেস— ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, এক অবহেলিত জমিদারের জেদের প্রতীক হয়ে।
আপনি যদি ঢাকায় থাকেন বা কখনও ওল্ড ঢাকায় বেড়াতে আসেন, তবে টিকাটুলির কে. এম. দাস লেনে চলে আসতে পারেন। একটু সময় করে দেখে আসতে পারেন ইতিহাসের এই অনন্য নিদর্শন। তবে মনে রাখবেন, শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে, আর বৃহস্পতিবার বন্ধ।
প্রাসাদের গায়ে এখনও নাম ফলকে লেখা রয়েছে 'রশিদ মঞ্জিল'। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি চিরকালই 'রোজ গার্ডেন'— এক অবমানিত জমিদারের আত্মমর্যাদার শেষ ঠিকানা।
