ঢাকা নামকরণের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের প্রথম ও সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকগাথাটি জড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলা সেন রাজবংশের সঙ্গে। দ্বাদশ শতকে বাংলার সেন বংশীয় রাজা বল্লাল সেন যখন বুড়িগঙ্গার নিকটবর্তী গভীর অরণ্যময় অঞ্চল পরিদর্শনে এসেছিলেন, তখন তিনি এক অভূতপূর্ব ঘটনার মুখোমুখি হন। জনশ্রুতি রয়েছে, রাজা বল্লাল সেন ছিলেন রাজা আদিশূরের এক অলৌকিক ধারার উত্তরসূরি এবং তিনি বুড়িগঙ্গার উত্তরাংশে এক গহিন জঙ্গলে বড় হয়েছিলেন। সেই জঙ্গলে ভ্রমণের সময় তিনি লতাগুল্ম ও ঘন জঙ্গলে আবৃত বা 'ঢাকা' অবস্থায় হিন্দু সনাতন ধর্মের দেবী দুর্গার একটি মূল্যবান বিগ্রহ বা মূর্তির সন্ধান পান। দেবী যেহেতু জঙ্গলের ভেতর গোপন ও ঢাকা অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছিলেন, তাই রাজা বল্লাল সেন শ্রদ্ধাবশত সেই স্থানে একটি মন্দির নির্মাণ করে দেবীর নাম রাখেন 'ঢাকেশ্বরী' অর্থাৎ 'ঢাকা অবস্থায় প্রাপ্ত ঈশ্বরী'। এই ঢাকেশ্বরী দেবীর নাম থেকেই কালক্রমে সংসংলগ্ন জনপদ ও সমগ্র নগরীর নাম হয়ে যায় ঢাকা। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বেশ কিছু ইউরোপীয় ও স্থানীয় লেখক, যেমন ড. জেমস টেলর ১৮৪০ সালে লিখিত তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থে এবং ফ্রান্সিস ব্রাডলি-বার্ট ১৯০৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত পুস্তকে এই কিংবদন্তির কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এই ধর্মীয় ও সামাজিক কিংবদন্তিকে পুরোপুরি মেনে নিতে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। ঢাকা জাদুঘরের প্রথম কিউরেটর ও প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী এবং ড. আহমদ হাসান দানী অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠভাবে দেখিয়েছেন যে, বর্তমানে বিদ্যমান ঢাকেশ্বরী মন্দিরের স্থাপত্যরীতি কিংবা ভেতরের বিগ্রহটি কোনোভাবেই দ্বাদশ শতকের বল্লাল সেনের আমলের নয়। বরং এটি সতেরো বা আঠারো শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো হিন্দু এজেন্ট অথবা মারাঠা যুগের প্রভাবে নতুন করে পুনর্নির্মিত হয়েছিল। অধিকন্তু, ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক গবেষক উল্টো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, দেবীর নাম থেকে শহরের নাম 'ঢাকা' হওয়ার চেয়ে বরং 'ঢাকা' নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণেই দেবীর নাম 'ঢাকেশ্বরী' (অর্থাৎ ঢাকার ঈশ্বরী বা অভিভাবক দেবী) হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত।
.jpg)
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের গল্পের পাশাপাশি ঢাকা নামকরণের আরেকটি অতীব রোমাঞ্চকর ও বহুল প্রচলিত ঘটনা জড়িয়ে আছে মুঘল সাম্রাজ্য এবং সুবাদার ইসলাম খান চিশতির ঢাকা বিজয়ের সঙ্গে। ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালে সুবাদার ইসলাম খান চিশতি যখন বারো ভূঁইয়াদের দমন ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সুবা বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে বুড়িগঙ্গার তীরে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি নৌবহর নিয়ে এই অঞ্চলে আগমন করেন। লোকমুখে প্রচারিত একটি চমৎকার আখ্যান অনুসারে, সুবাদার ইসলাম খান যখন প্রথম এই এলাকায় পা রাখেন, তখন তিনি নতুন রাজধানীর ভৌগোলিক ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত অবস্থান দেখে অত্যন্ত প্রীত হন। তিনি নগরীর সীমানা নির্ধারণ করার জন্য একটি অভূতপূর্ব পথ অবলম্বন করেন। সুবাদার তাঁর অনুচরদের শহরের একটি কেন্দ্রীয় স্থান থেকে বাদ্যযন্ত্র 'ঢাক' (এক ধরণের বড় অনুভূমিক ড্রাম) বাজানোর নির্দেশ দেন এবং একই সাথে তিনজন সৈনিককে পতাকা হাতে পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিকে প্রেরণ করেন। নির্দেশ ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত ঢাকের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাবে, ততক্ষণ সৈনিকেরা অগ্রসর হতে থাকবে এবং যেখানে গিয়ে ঢাকের শব্দ মিলিয়ে যাবে, সেখানেই রাজকীয় পতাকা পুঁতে সীমানা প্রাচীর তৈরি করা হবে। এই ঢাকের আওয়াজ দিয়ে সীমানা নির্ধারণের ঐতিহাসিক ও আনন্দঘন ঘটনা থেকেই সাধারণ মানুষের মুখে মুখে শহরটির নাম 'ঢাকা' হিসেবে স্থায়ী রূপ লাভ করে। এই একই ঘটনার আরেকটি লোকপ্রচলিত শাখা গল্পে বলা হয়, ইসলাম খান যখন বুড়িগঙ্গার তীরে এসে নামেন, তখন তিনি স্থানীয় কিছু কাঠুরিয়াকে গাছ কাটতে দেখে স্থানটির নাম জানতে চান। কাঠুরিয়ারা রাজকীয় ভাষা বুঝতে না পেরে ভেবেছিল সুবাদার তাদের জিজ্ঞাসা করছেন তারা কী কাটছে। তারা নিজেদের আঞ্চলিক ভাষায় উত্তর দিয়েছিল 'ঢাক-কা' (অর্থাৎ ঢাক গাছ কাটছি), যা থেকে সুবাদার ধরে নেন স্থানটির নাম ঢাকা। যদিও এই গল্পগুলো শুনতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ঢাকার লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, তথাপি বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিক বিচারে ড. আবদুল করিম, সিরাজুল ইসলাম এবং যদুনাথ সরকারের মতো প্রথিতযশা ঐতিহাসিকগণ এই গল্পগুলোকে স্রেফ কাল্পনিক রূপকথা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের শক্তিশালী যুক্তি হলো, সুবাদার ইসলাম খান ঢাকাকে বিজয়ের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সম্মানার্থে 'জাহাঙ্গীরনগর' নামকরণ করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইসলাম খান চিশতি ঢাকায় আসার বহু আগেই ঐতিহাসিক মানচিত্র ও প্রশাসনিক নথিতে 'ঢাকা' নামের অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিল।
কিংবদন্তি ও রূপকথার সীমানা পেরিয়ে যখন আমরা প্রাকৃতিক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানভিত্তিক ঐতিহাসিক গবেষণার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সামনে উঠে আসে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় যেকোনো জনপদের নামকরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় নদ-নদী, জমি ও উদ্ভিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত অপরিসীম। ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশবিদদের মতে, বর্তমান ঢাকা অঞ্চলটি একসময় ভাওয়ালের গহিন বনাঞ্চলেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ ছিল এবং বুড়িগঙ্গা, বুড়িগঙ্গার প্রাচীন শাখা ও তুরাগ নদীর অববাহিকায় এখানে প্রচুর পরিমাণে 'ঢাক' গাছ জন্মাত। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঢাক গাছকে বলা হয় Butea frondosa বা Butea monosperma, যা আমাদের ঐতিহ্যে পলাশ বা মধ্যযুগীয় বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। বসন্তকালে যখন এই ঘন ঢাক গাছে লাল ও লালচে-কমলা রঙের ফুলের সমারোহ ঘটত, তখন দূর থেকে মনে হতো সমগ্র প্রান্তর আগুনে জ্বলছে। বাংলা অঞ্চলের অসংখ্য অঞ্চলের নামকরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বৃক্ষরাজির প্রাচুর্য থেকে স্থানের নামকরণ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিক্রমা। উদাহরণস্বরূপ, যেভাবে শিমুল গাছের আধিক্য থেকে শিমুলতলী, জাম গাছ থেকে জামতলা বা সুন্দর গাছ থেকে সুন্দরবন নামের উৎপত্তি হয়েছে, ঠিক তেমনি বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাক গাছের এই অবারিত বনাঞ্চল ও প্রাচুর্যের কারণে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে এই পুরো এলাকাটি 'ঢাকা' বা ঢাক-বৃক্ষের জনপদ নামে পরিচিতি লাভ করে। ঢাকা জাদুঘরের প্রথম দিকের গবেষক ড. জেমস ওয়াইজ এবং অধ্যাপক আবদুল করিমের মতো প্রখ্যাত ইতিহাসবিদগণ এই উদ্ভিদবিজ্ঞানভিত্তিক মতবাদটিকে অন্যান্য কাল্পনিক বা অলৌকিক গল্পের চেয়ে অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত, ভৌগোলিক প্রমানসম্মত ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার কাছাকাছি বলে মনে করেন।
উদ্ভিদবিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি ঢাকা নামকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয় ভাষাতত্ত্ব ও প্রাচীন উপভাষার গবেষণার মাধ্যমে। ভাষা রূপান্তরের বিবর্তনীয় ধারায় দেখা যায়, প্রাচীন ও প্রাক-মুসলিম বাংলায় এই মধ্য-পশ্চিম বঙ্গীয় সমতল অঞ্চলে এক ধরণের বিশিষ্ট প্রাকৃত ভাষা বা উপভাষা প্রচলিত ছিল। বেশ কয়েকজন ভাষাবিদ ও প্রাচ্যবিদ তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, প্রাচীনকালে এই অববাহিকায় বসবাসকারী আদিবাসীদের উপভাষাকে বলা হতো ‘ঢাকাভাষা’ বা ‘ঢাকিয়া প্রাকৃত’। জনপদের অধিবাসীদের কথ্য ভাষা ও প্রাকৃত উপভাষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে বাইরের অঞ্চল থেকে আগত বণিক, ভ্রমণকারী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এই স্থানটিকে ‘ঢাকাভাষার অঞ্চল’ বা সংক্ষেপে ‘ঢাকা’ বলে অবহিত করতে শুরু করেন। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষার নাম থেকে পরবর্তীতে ভৌগোলিক স্থানের নামকরণের এই ভাষাতাত্ত্বিক ধারা পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতায়ও বহুলভাবে লক্ষ্য করা যায়। ফলে ‘ঢাকিয়া প্রাকৃত’ বা ‘ঢাকাভাষা’ তত্ত্বটি কেবল একটি জল্পনা-কল্পনা নয়, বরং প্রাচীন বাংলার সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনের এক শক্তিশালী ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
সামরিক ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে ঢাকা নামকরণের আরেকটি অত্যন্ত গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ ও রাজকবি কলহণ দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থ ‘রাজতরঙ্গিণী’-তে ‘ঢাক্কা’ নামক একটি শব্দের কথা বারংবার উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন সংস্কৃত ও প্রাকৃত অভিধানে এবং কলহণের বর্ণনায় ‘ঢাক্কা’ শব্দের মূল অর্থ হলো ‘পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’, ‘প্রহরা চৌকি’ বা ‘ওয়াচটাওয়ার’ (Watchtower)। এই সামরিক তত্ত্বটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. ডি. সি. সরকার এবং আধুনিক সামরিক ইতিহাসবিদগণ ঢাকার ভূ-সংস্থান বা টপোগ্রাফির দিকে নির্দেশ করেন। প্রাচীনকালে বাংলার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ও সমৃদ্ধ রাজধানীগুলো অবস্থিত ছিল বিক্রমপুর এবং সোনারগাঁওয়ে। ভৌগোলিক বিচারে বিক্রমপুর ও সোনারগাঁও অঞ্চলের ভূমির তুলনায় ঢাকার ভূখণ্ডটি ছিল কিছুটা উঁচু এবং এটি মধুপুর গড়ের দক্ষিণ প্রান্তীয় উচ্চভূমির অংশ হিসেবে গঠিত ছিল। চারদিকে নদ-নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং পার্শ্ববর্তী নিম্নাঞ্চলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত উঁচু এই ভূখণ্ডটি বহিরাগত শত্রু, জলদস্যু ও নৌ-আক্রমণ থেকে তৎকালীন প্রধান শহরগুলোকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত আদর্শ সামরিক ওয়াচপোস্ট বা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রাচীন পাল ও সেন রাজাদের আমলে কিংবা তারও আগে জলপথে শত্রুর আগমন বার্তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য বুড়িগঙ্গার তীরের এই উঁচু ভূমিতে যে সামরিক প্রহরা চৌকি বা ওয়াচটাওয়ার স্থাপন করা হয়েছিল, সেই 'ঢাক্কা' বা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকেই স্থানটি কালক্রমে 'ঢাকা' নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সামরিক ব্যাখ্যাটি প্রমাণ করে যে, মুঘলদের আগমনের বহু পূর্ব থেকেই ঢাকা ছিল প্রাচীন বাংলার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিরক্ষা ঘাঁটি।
ঢাকা নামকরণের ঐতিহাসিক অনুসন্ধানকে আরও সুদৃঢ় ও বস্তুনিষ্ঠ করে তোলে প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল, প্রাচীন শিলালিপি, প্রাচীন তাম্রশাসন এবং মানচিত্রের প্রমাণসমূহ। চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দে গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিখ্যাত প্রখ্যাত কবি হরিশেষণ কর্তৃক লিখিত ও এলাহাবাদ স্তম্ভে খোদাইকৃত সমুদ্রগুপ্তের ‘প্রয়াগ প্রশস্তি’ শিলালিপিতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তপ্রদেশের বিবরণ দিতে গিয়ে ‘ডবাক’ বা ‘দাবাক’ (Davaka) নামক একটি সীমান্ত রাজ্যের কথা বলা হয়েছে। কোনো কোনো প্রাচীন ঐতিহাসিক মনে করতেন যে, এই সমুদ্রগুপ্তের শিলালিপিতে বর্ণিত ‘ডবাক’ রাজ্যটিই রূপান্তরিত হয়ে আধুনিক ‘ঢাকা’ রূপ ধারণ করেছে। তবে আধুনিক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সমুদ্রগুপ্তের শিলালিপির ‘ডবাক’ প্রকৃতপক্ষে আসামের হোজাই জেলার ডবোকা অঞ্চলকে নির্দেশ করে, যা ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান থেকে বেশ দূরে। কিন্তু মুসলিম শাসনের সূচনা ও সুলতানি আমলে লিখিত নথিপত্রে ঢাকার লিখিত নাম স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত গৌড়ের সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের শাসনকালের (১৪৬০ খ্রিষ্টাব্দ) একটি শিলালিপি, যা ভারতের বীরভূম জেলায় আবিষ্কৃত হয়েছিল, সেখানে স্পষ্টাক্ষরে ‘দাহাকা’ (Dahaka) নামক একটি প্রশাসনিক অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। এই ‘দাহাকা’ যে বুড়িগঙ্গার তীরের ঢাকাই নির্দেশ করছে, সে বিষয়ে বহু মধ্যযুগীয় ইতিহাসবিদ প্রায় একমত।
ঢাকা যে মুঘল আমলের পূর্বেই আন্তর্জাতিক মানচিত্রবিদ ও প্রাক-মুঘল সুলতানদের কাছে একটি সুপরিচিত কেন্দ্র ছিল, তার সবচেয়ে বড় ও অলঙ্ঘনীয় প্রমাণ মেলে ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় মানচিত্রে। ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত পর্তুগিজ ঐতিহাসিক ও মানচিত্রকর জোয়াও দ্য ব্যারোস (João de Barros) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডেকাদাস দা আসিয়া’ (Décadas da Ásia)-র অংশ হিসেবে প্রাচীন বাংলার যে মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন, তাতে তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে স্পষ্ট হরফে "Daca" (ডাকা/ঢাকা) স্থানটি নির্দেশ করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, ১৬১০ সালে সুবাদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকায় আসার অন্তত ৬০ বছর আগেই ইউরোপীয় বণিক, পর্তুগিজ নাবিক ও ভূগোলবিদদের নথিপত্রে ঢাকা নামটি স্থান লাভ করেছিল। তাছাড়াও মুঘল সম্রাট আকবরের রাজসভাকবি আবুল ফজল কর্তৃক রচিত বিখ্যাত আকরগ্রন্থ ‘আকবরনামা’-তে ঢাকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘থানা’ বা সামরিক সামরিক ফাঁড়ি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবুল ফজলেরই আরেকটি বিখ্যাত প্রশাসনিক রূপরেখা ‘আইন-ই-আকবরী’-তে মুঘল প্রশাসনিক বিভাগ ‘সরকার বাজুহা’-র অধীনে ‘ঢাকা বাজু’ নামক একটি পরগনার অস্তিত্ব সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ও মানচিত্রের তথ্য প্রমাণ করে যে, ঢাকা নামের উৎপত্তি কোনো একক মুঘল সুবাদারের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত বা কোনো আকস্মিক ঢোল বাজানোর ঘটনার ফসল নয়; বরং এটি শত শত বছর ধরে রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি অতি প্রাচীন নাম।
১৬১০ সালে যখন মুঘল সাম্রাজ্য বাংলার ভৌগোলিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করে, তখন ঢাকা একটি সাধারণ সামরিক ফাঁড়ি থেকে এক লাফে এক বিশাল বৈশ্বিক প্রশাসনিক মহানগরীতে রূপান্তরিত হয়। সুবাদার ইসলাম খান চিশতি নতুন রাজধানী উদ্বোধন করে তৎকালীন মুঘল সম্রাট নুরুদ্দীন মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এই শহরের দাপ্তরিক নাম রাখেন ‘জাহাঙ্গীরনগর’। পরবর্তী প্রায় এক শতাব্দীকাল ধরে মুঘল দরবারের রাজকীয় ফরমান, সুবাদারি নথি, রাজস্ব খাতা এবং রৌপ্যমুদ্রায় ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামটিই অত্যন্ত মর্যাদা ও দাপ্তরিক গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সত্য হলো, সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক কাগজপত্রে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ লেখা হলেও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে, বুড়িগঙ্গার ঘাটে, বণিকদের মুখে এবং লোকসংগীতে প্রাচীন ও পরিচিত ‘ঢাকা’ নামটিই রয়ে গিয়েছিল অমলিন ও অপরিবর্তনীয়। শুধু স্থানীয় অধিবাসীরাই নয়, তৎকালীন সময়ে ঢাকায় আগত বিদেশি পর্যটক ও বণিকগণ—যেমন ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী জ্যাঁ বাপতিস্ত তাভের্নিয়ে, ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ে, ইতালীয় পর্যটক নিকোলাও মানুচ্চি কিংবা প্রখ্যাত আগস্টিনিয়ান ধর্মপ্রচারক সেবাস্টিয়ান মানরিক—তাঁদের সফরনামা ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে রাজকীয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামের পরিবর্তে ‘ঢাকা’ বা ‘Dacca’ নামটিই ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলেন। সুবাদার শাহ সুজা, মীর জুমলা কিংবা শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকার সীমানা যখন পশ্চিমে মানেশ্বর থেকে পূর্বে নরিন্দা এবং উত্তরে রমনা বা ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছিল, তখনও এই সুবিশাল প্রশাসনিক ক্যানভাসের একমাত্র লোকপ্রিয় নাম ছিল ঢাকা। পরবর্তীতে ১৭১৭ সালে সুবাদার মুর্শিদ কুলি খান যখন রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে তাঁর নিজের নামানুসারে 'মুর্শিদাবাদে' স্থানান্তর করেন, তখন ঢাকার দাপ্তরিক রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস পেলেও 'ঢাকা' নামটির সার্বজনীন জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি।
আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান ঘটে এবং প্লাসির যুদ্ধের পর ঢাকা তার রাজকীয় রাজধানীর জৌলুস হারিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে একটি আঞ্চলিক জেলা সদরদপ্তরে পরিণত হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগণ বাংলা ভাষার মূল উচ্চারণ বজায় রাখার পরিবর্তে নিজেদের ইংরেজি উচ্চারণের সুবিধার্থে শহরের বানান নির্ধারণ করে ‘Dacca’। ইংরেজি নথিপত্র, ভূগোলের বই এবং প্রশাসনিক তালিকায় দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ‘Dacca’ বানানটিই ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন হলেও নামের মূল ভাবাবেগে কোনো আঘাত লাগেনি। ১৮২৯ সালে যখন ঢাকাকে একটি বড় বিভাগের সদরদপ্তর করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গের পর যখন ঢাকাকে পুনর্গঠিত ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ প্রদেশের রাজধানী করা হয়, তখন এই ‘Dacca’ বা ঢাকা আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসে। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর ঢাকা যখন পূর্ব বাংলার মূল রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনও ইংরেজি বানানে ‘Dacca’ বজায় ছিল। অবশেষে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্যাগ ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটলে, ঢাকা বিশ্ব দরবারে একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে সরকারিভাবে নির্দেশ জারি করে ঔপনিবেশিক ইংরেজি বানান ‘Dacca’-কে পরিবর্তন করে বাংলা উচ্চারণের সাথে অবিকল মিল রেখে আন্তর্জাতিকভাবে স্বকীয় ‘Dhaka’ বানান গ্রহণ করা হয়।
ঢাকা শহরের নামকরণ এবং তার ঐতিহাসিক বিবর্তনের দিকে তাকালে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই নামটির পেছনে কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনা, নির্দিষ্ট রাজা বা নির্দিষ্ট কোনো সুবাদারের একক অবদান নেই। বরং রাজা বল্লাল সেনের ঢাকেশ্বরী দেবীর বিগ্রহ আবিষ্কারের ভক্তিপূর্ণ আখ্যান, সুবাদার ইসলাম খানের রাজকীয় ঢোল বাজিয়ে সীমানা নির্ধারণের উদ্দীপনা, প্রাচীন অববাহিকায় ঘন হয়ে ফুটে থাকা রক্তিম ঢাক বৃক্ষের অপরূপ প্রাকৃতি সৌন্দর্য, আদিবাসীদের কথ্য ‘ঢাকাভাষা’ উপভাষা এবং প্রাচীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কৌশলগত ‘ঢাক্কা’ বা ওয়াচটাওয়ার—এই সবকটি নদীর ধারার মতো এসে মিশেছে একই মোহনায়। এই বহুমুখী তত্ত্ব ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণেই রূপ নিয়েছে আমাদের আজকের আধুনিক মেগাসিটি ঢাকা। বুড়িগঙ্গার বুকে বহমান স্রোতের মতো ঢাকা শহর তার নামকে কোনো নিছক মৃত ইতিহাসের পাতায় আটকে রাখেনি; এটি যুগে যুগে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করেছে এবং প্রতিটি বাঁকে নিজের নামের ঐতিহ্যকে রক্ষা করে চলেছে। তাই বলা যায়, 'ঢাকা' নামটি কেবল একটি শব্দের সমাহার নয়, এটি হলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা বাঙালি জাতির এক গৌরবোজ্জ্বল ও স্বাভিমানী সংকেত—আমাদের ইতিহাসের এক অনবদ্য এবং চিরচেনা 'Active Identity'।